হাদিস গ্রন্থ সমূহের মধ্যে “সহীহ বুখারী” সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
এর মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয় যে,
-আসমানের নিচে এবং আল্লাহর কিতাব (অর্থাৎ কোরানের) পরে মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য কিতাব।
আপনি কি জানেন যে বুখারীর বিপরীতে অন্য একটি হাদিস গ্রন্থ মুসলিমদের মাঝে বহুল প্রচলিত। আর তা হচ্ছে “মুখারী হাদিস”। এই গ্রন্থের হাদিসগুলো কোনো হাদিসের কিতাবে পাওয়া যায়না, খালি কিছু মূর্খ মুসলমানের মুখে মুখে প্রচলিত, আর পাওয়া যাবে ফাযায়েলের বিভিন্ন কিতাব সমূহে, বিভিন্ন ওযীফার কিতাব যেমন- বারোচান্দের ফজিলত, নেয়ামুল কোরআন, বেহেশতী জেওর ইত্যাদি নামে কিছু বেদাতী মাওলানাদের বই পুস্তকে।
উদাহরণ হিসেবে নিচে কয়েকটি ‘মুখারী হাদিস’ পেশ করা হলো -
■ কেউ যদি ৭০ হাজার বার কালিমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ে বা পড়ে মৃত ব্যক্তির জন্য উৎসর্গ করে তাহলে সে বা ঐ মৃত ব্যক্তি জান্নাতে যাবে। [ফাজায়েলে তাবলীগ পৃঃ ৪৪১]
→এটা একটা জাল হাদিস। তবে হ্যাঁ কালেমা তাইয়েবা পড়ার অনেক ফযিলত আছে কিন্তু ঠিক এই কথাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ হতে প্রমাণিত নয়। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা বলেন, এটি সহীহ বা জয়ীফ কোনো সনদেই বর্ণিত নেই। [মাজমুয়ায়ে ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যা ২৪/৩২৩, প্রচলিত জাল হাদিস ১৯৩]
■ নামাজ মুমিনের মেরাজ স্বরূপ।
→ জাল হাদিস, এর কোন নির্ভরযোগ্য সনদ নেই [প্রচলিত জাল হাদিস, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ জুনাইদ বাবুনগরী, পৃঃ১৯৫]
■ ইসলামের প্রথম দিকে সাহাবীরা হাতের নিচে মূর্তি নিয়ে নামায পড়তো, আর এই জন্য রসূল ﷺ রুকুর আগে ও পরে রফউল ইয়াদাইন করতেন।
→ সাহাবীদের সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ দেয়া এই কথাটি জাল, কোনো হাদিস গ্রন্থে নেই।
■ সাদ্দাদ দুনিয়াতে জান্নাত বানিয়েছিল।
→ জাল গল্প, বিষাদসিন্ধু ছাড়া অন্য কোন হাদিসের পুস্তকে এমন কোন কথার অস্তিত্বই নেই।
■ এক ওয়াক্ত নামায কাজা করলে ৮০ হোকবা বছর আগুনে পুড়তে হবে।
→ ফাজায়লে নামাজ ও আরও কিছু বিত’আতী কিতাব ছাড়া কোনো হাদিস গ্রন্থে এই হাদিস দেখা যায় না।
■ চিল্লায় গিয়ে ১ টাকা দান করলে ৪৯ কোটি টাকার নেকী পাওয়া যায়।
→ তাবলীগ জামায়াতের উদ্ভাবিত ভিত্তিহীন ও সনদ-বিহীন জাল কথা। তবে ২টি জঈফ হাদিসের ফজিলতকে গুন করে যারা এই হিসাবকে জায়েজ বানানোর চেষ্টা করেন; তারা সাবধান, আল্লাহকে ভয় করুন!
■ যার কোন পীর নাই তার পীর শয়তান।
→ এটা পীর সূফীদের বানানো এটা একটা জাল হাদিস। [খাইরুল ফাতওয়া, খণ্ড ১, পৃঃ৩৬১; ইমদাদুল ফতাওয়া খণ্ড-৫, পৃ:২৩৬-২৩৮; প্রচলিত জাল হাদিস পৃ: ১৯১]
■ মুমিনের কলব আল্লাহর আরশ।
→ পীর সূফীদের বানানো এটা একটা জাল হাদিস।
■ দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করো।
→ এটাও একটা জাল হাদিস। এটা মূলত আরবি ভাষার একটা প্রবাদ।
■ আমার উম্মতের আলেমগনের মর্যাদা বনী ইসরাইলের নবীগণের তুল্য।
→ এটা একটা দুর্বল/জাল হাদিস। তবে এমন একটি সহীহ হাদিস হচ্ছে, আলেমরা হল নবীগণের ওয়ারিশ।
■ আলেমদের সাথে এক মুহূর্ত কাটানো ৬০ বছরের নফল ইবাদত থেকে উত্তম, কোন আলেমের পিছনে ১ রাকাত নামায পড়া নিজে নিজে ১০০০ রাকাত নফল নামায পড়া থেকে উত্তম।
→ এগুলি সব জাল হাদিস। রাসূলুল্লাহ ﷺ নেক্কার লোকদের সাথে উঠবস করতে বলেছেন কিন্তু এই জাতীয় কথা উনি বলেছেন এমন কোন সহীহ হাদিস নাই!
■ স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত!
→ এটাও একটা জাল হাদিস। মূল হাদিস টা হল মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।
■ মসজিদে দুনিয়াবী কথা বলা হারাম, মসজিদে দুনিয়াবী কথা বললে ৪০ বছরের নেকী নষ্ট হয়ে যায়!
→ এটাও বহুল প্রচারিত একটি জাল হাদীস। রাসূলুল্লাহ ﷺ মসজিদে নব্বীর ভিতরেই বিচার কার্য, জিহাদ সংক্রান্ত অনেক আলোচনা করেছেন।
■ বিবাহিত ব্যক্তির ২ রাকাত নামাজ অবিবাহিত ব্যক্তির ৭০ রাকাত নামাজ অপেক্ষা উত্তম!
→ এটাও একটা জাল হাদিস।
■ যে নিজেকে চিনল সে তার রব কে চিনল।
→ কেউ কেউ এটাকে হযরত আলীর (রাঃ) এর উক্তি হিসাবে প্রচার করে থাকেন। যদিও ঐ সনদটি জাল।
■ যে ব্যক্তি বরকতের জন্য সন্তানের নাম মুহাম্মদ রাখবে, ঐ সন্তান ও তার পিতা উভয়েই জান্নাতে যাবে।
→ এটাও একটা জাল হাদিস। বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন তোমরা নবীদের নামে নাম রাখ এবং আল্লাহ তায়ালার নিকট সবচেয়ে প্রিয় নাম হল আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান।
■ রাসূলুল্লাহ ﷺ সৃষ্টি না করলে জান্নাত জাহান্নাম দুনিয়া সৃষ্টি করতেন না।
→ প্রচলিত মিলাদে পঠিত সবচাইতে প্রসিদ্ধ জাল হাদিস।
■ সর্বপ্রথম আল্লাহ সুবহানাতায়ালা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নূর তৈরী করেছেন তারপর ঐ নূর থেকে দুনিয়ার সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন, যখন আদম সৃষ্টি হয়নি তখনও আমার নূর ছিল।
→ এই জাতীয় সকল বর্ণনাগুলি জাল হাদিস।
►►মন্তব্যঃ-
সর্বশেষ, যারা এমন মিথ্যা হাদিস মানুষের মাঝে প্রচার করে বেড়ায় তাদের শাস্তি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন,
-যে ব্যক্তি আমার উপর মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা খুজে নেয়। [বুখারী হা/৩৪৬১]
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সকলকে জাল হাদিস বর্জন করে সহীহ হাদিস বুঝে জীবন চলার তৌফিক দান করুন। আমিন...!
